“ত্রিপুরার কবিতা চর্চায় শূন্যদশক এবং তৎপরবর্তী কবিদের কবিতা ঃ ভূমিকা এবং সম্ভাবনা ”
সময়ের দিকে খেয়াল রেখে আমরা যদি আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তবে খুব সংক্ষেপে এবং সরাসরি আমাদের পূর্বজদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকাকে স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয়, আমরা খুবই উজ্জ্বল একটি পটভূমি পেয়েছি আমাদের পূর্বজদের কাছ থেকে । প্রায় প্রস্তুত করা একটা কাব্যিক-সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত আমরা পেয়েছি । বিশেষ করে ১৯৮১ সালের প্রথম আগরতলা বইমেলা শুরুর মধ্যে দিয়ে আমাদের একটি দিগন্ত খুলে যায়। একক প্রচেষ্টা থেকে যৌথ একটা উন্মাদনায় আমরা পা রাখি । যা ক্রমে ক্রমে তার পালক আরও প্রসারিত এবং বিস্তৃত করে । সেই ক্রমেই আমরা আমাদের কাব্যিক-চেতনার শুরুতেই একটা উজ্জ্বল পটভূমি পেয়ে যাই । আমাদের পূর্বজদের বিশেষ করে সত্তর দশকের কবি- সাহিত্যিকদের যে সংগ্রাম করে নিজেদের কথা, কবিতা, গল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে, আমাদের ততটা কষ্ট করতে হয়নি । ত্রিপুরার কবিতা আন্দোলনে সত্তর দশকের পর নব্বইয়ের দশক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে । গোটা বাংলা কবিতার জগতেই এই দশক-কাল উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে । সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কবি- সাহিত্যিকরা চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করেছেন । ত্রিপুরায় ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি । কবিতায় সটান কথা, সটানভাবে বলার স্পর্ধা বাড়ে । তথাকথিত ছন্দের বাইরে গিয়ে বক্তব্যের উপরে জোর চলে আসে । এই দশক জীবনকে দেখতে চেয়েছে তথাকথিত ছন্দের বাইরে থেকে । বিশ্ব-প্রেক্ষাপটও তাতে যথেষ্ট ইন্দন যুগিয়েছে ।
যাই হোক, আমি আমার নির্ধারিত বিষয় –“ত্রিপুরার কবিতা চর্চায় শূন্যদশক এবং তৎপরবর্তী কবিদের কবিতা ঃ ভূমিকা এবং সম্ভাবনা” এ-বিষয়ে সরাসরি প্রবেশ করছি ।
শূন্যদশক কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় । এই প্রজন্ম, বিশ্ব এবং বিশ্বায়নের প্রভাবের সরাসরি স্বীকার হয়েছে শুরু থেকেই । তত্ত্ব এবং তাত্ত্বিক বিশ্ব তখন দিশেহারা । বিশ্ব- রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন সব কিছুই দ্রুত ভাঙছে, গড়ছে । যেমন প্রবন্ধ সাহিত্যে, যেমন গদ্য সাহিত্যে, তেমনি কবিতায়ও । নব্বইয়ের দশকের সূত্র ধরেই আমরা ছন্দ থেকে সরাসরি চলে আসি কবিতায় ‘কথা’-কে গুরুত্ব দিয়ে । এই প্রেক্ষাপটে শূন্য দশকের কবিরা প্রথমেই শিকড় গাঁথলেন সরাসরি কথাকে গুরুত্ব দিয়ে । সদ্য আসা তরুণ কবিরা লিরিখ প্রবণতা থেকে সরে পড়লেন ক্রমশ । আপাত সরল বাক্য গঠনের পাশাপাশি কবিতার বিষয়বস্তু করে তুললেন একান্ত ব্যক্তিগত । বিষয়-ভিত্তিক । সরাসরি আক্রমণ করে বসলেন টার্গেট-কে । কাব্যিক চতুরতা থেকে সরে গিয়ে কথাকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়কে নিয়ে এলেন সরাসরি । পাঠককে বাধ্য করলেন, তার পুরনো পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে সরে আসতে । পাঠকের সাথে কবির যোগসূত্র যেন নতুন করে শুরু হতে থাকে । কবিরা যেন বাধ্য করলেন পাঠককে তার পুরনো ফ্রেম বা পুরনো পাঠ্যাভ্যাস থেকে সরে আসতে । কবি লিখতে থাকলেন তার স্বভাব, মেজাজ অনুযায়ী । কাব্যের আদর্শ ভাষা হতে থাকল সর্বসাধারণের কথিত ভাষার মতো । বাঁক নিতে থাকল বাক্যের প্রয়োগে, উপমার ব্যবহারে । কল্পচিত্র অঙ্কনে । দেশজ-লোকজ শব্দের অবাধ ব্যবহার শুরু হতে থাকল । পুরনো অভ্যস্ত কাঠামো ভেঙে নতুন বাক্য কাঠামো তৈরি হতে থাকল ।
জীবন ও জগতের সংস্পর্শে কবি যা অনুভব করেন, যে-উপলব্ধি তাঁর হয়, যে মানসিক ও ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা তাঁকে নাড়ায়, শূন্য দশকের কবিরা তাই ব্যক্ত করতে লাগলেন তাঁর কবিতায় । ছন্দ- কাঠামোর যান্ত্রিকতা থেকে সরে এলেন এই দশকের বেশির ভাগ কবিরা । শূন্য দশকের কবিরা যেন বলতে চাইলেন – “কবির অনুভব বা উপলব্ধির প্রকাশই যদি কবিতার আসল লক্ষ্য হয়, তাহলে বাইরের কয়েকটা চিহ্ন বা ছন্দ দেখে কবিতাকে চিনতে হবে কেন ? কবির অনুভূত বা উপলব্ধ বক্তব্যকে গদ্যে প্রকাশ করা যাবে না কেন ?” এই ভাবনা থেকেই কবিতা বাঁক নিতে থাকে কবিতার দিকে, কবিতার ভিতর দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে লাগল নতুনভাবে , একান্ত নিজের মতো করে। যা আজও বহমান ।
ত্রিপুরার কাব্য জগতে নব্বইয়ের দশকে আমরা জাফর সাদেক, তপন দেবনাথ প্রবুদ্ধসুন্দর কর এবং অশোক দেব, আকবর আহমেদ, বিমল চক্রবর্তীসহ আরও অনেক শক্তিশালী কবিদের পেয়েছি। জাফর সাদেকের ভাষা-শৈলী, বাক্যের গঠন, বলার ভঙ্গি, বিষয় ও বলার কৌশল আমাদের যেমন প্রভাবিত করেছিল । তেমনি প্রভাবিত করেছিল প্রবুদ্ধসুন্দর কর-এর তীব্র ব্যঙ্গ, শ্লেষ বাক্য গঠনের চাতুর্য। অশোক দেব–এর কবিতার বিষয় সচেতনতা, প্রয়োগ-কৌশল,আপাত সংবেদনশীল মায়াবী শব্দ-বন্ধের আড়ালে গভীর এক জীবনবোধের নির্মাণ, আমাদের একটা শক্ত পটভূমি দিয়েছিল বই-কি !
শূন্য দশকে এসে আমরা উল্লেখযোগ্য কবি পাচ্ছি –
প্রদীপ মজুমদার, পঙ্কজ বণিক, মৃদুল দেবরায়, প্রাণজয় সিনহা, খোকন সাহা, অনিরুদ্ধ
সাহা, গুপেশ চক্রবর্তী, সুস্মিতা চৌধুরী, রাজীব মজুমদার, অভিজিৎ চক্রবর্তী,
অমলকান্তি চন্দ, সঞ্জীব দে আরও প্রমুখদের
। প্রদীপ মজুমদারের সটান নির্মল বাক্য ব্যবহার, পঙ্কজ বণিকের কবিতায় আমরা নিজস্ব
একটা ভাষা-শৈলী দেখতে পাই । স্থানীয় চেতনায় নতুন এক উচ্চারণ-ভঙ্গিমা । গ্রামীণ উপকরণের আড়ালে আধুনিক এক জীবন সংকট
তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেন । মৃদুল দেবরায়ের কবিতার ভিতর দিয়ে আমরা আধুনিক
জীবনের ভিতরে এক মনস্তাত্তিক উঠা-নামা দেখতে পাই । খুব স্বাভাবিক চিত্রকল্পের
ছত্রে ছত্রে জড়িয়ে অনায়াসে জড়িয়ে দেন জীবনের জটিলতাকে । যে চিত্রশৈলী এর আগে আমরা
ত্রিপুরার কবিতায় লক্ষ করিনি । প্রাণজয় সিনহা তাঁর কবিতায় খুব অনায়াসে
যুগ-যন্ত্রণাকে তুলে ধরেন । আমাদের চারপাশের হিপোক্রেসিকে কবিতার পরতে পরতে গুঁজে
দেন গভীর এক বিশ্লেষণী চেতনায় । আমাদের
স্বাভাবিক জীবনের বাঁকে বাঁকে দেখে ফেলেন সামাজিক জীবনযাপনের অস্বাভাবিক কিছু
প্রবণতাকে। এই দেখা, এই পর্যবেক্ষণ, এই বিশ্লেষণ আমরা শূন্য
দশকে এসে দেখতে পাই । অভিজিৎ চক্রবর্তী শূন্যদশকের খুবই উল্লেখযোগ্য একজ কবি ।
জীবনকে নিয়ে চর্চা করেন নিজস্ব এক ভঙ্গিমায় । আমাদের যাপনের প্রতিটি পর্বকেই তিনি
তাঁর কবিতায় দেখার চেষ্টা করেছেন । অনিরুদ্ধ সাহা-র কবিতায় আমরা তার
নিজস্ব আরেকটা ঢঙ দেখতে পাই । জীবনের ভেঙে দেখতে জানে সে । আমাদের মনোজগতকে
খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে তাই সে বলে উঠে – “ মৃত্যুর গা ঘেঁষে যেতে পারে /
একমাত্র ভালোবাসা।” তার কবিতার শক্তি তার পর্যবেক্ষণের বিস্তারে । জীবনবোধের গভীরে
মিশিয়ে দেয় এক অদ্ভুত মায়া । পরম এক ভালোবাসা ।
সবার কবিতার বা কবির কবিতার বৈশিষ্ট্য নিয়ে পৃথকভাবে না-বলে বলতে চাইছি – মোদ্দা অর্থে আমরা শূন্য দশকের ভিতরে শূন্যতার, ঠাঁইহীন অস্থিরতার একটা হাহাকার দেখতে পাই । সব পাওয়ার দেশে আমরা একটা নিঃস্বতায় হারিয়ে যেতে থাকি । কবিতায় উঠে আসে পারিবারিক অস্থিরতা, দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রেমের ক্ষেত্রে একটা অস্থিরতা । একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতাবোধ, বিশ্বাসহীনতা গ্রাস করতে থাকে বুকের ভিতর, যার থেকে যেন কোনো নিস্তার নেই । তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই তার কবিতায় সমকালীন বাস্তবতা উঠে আসতে থাকে তার কবিতায় । ব্যক্তি- বিচ্ছিন্নতা তাঁকে ক্লান্ত করতে থাকে । সে সবই তাদের কবিতায় অনায়াসে স্থান পেয়েছে । তারা কথা বলেছে দ্বিধাহীনভাবে । অনেক সময় তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে নিজের পাশপাশি আমাদের সমকালীন ব্যবস্থাকে ।
আমাদের
ত্রিপুরায় শূন্য দশকের পরবর্তী পর্যায়ে
আমরা উল্লেখযোগ্য অনেক তরুণ কবিদের দেখা পাচ্ছি । এর মধ্যে সুমন পাটারী, জেরী
চন্দ, শুভদীপ দেব, চিরশ্রী দেবনাথ, সুব্রত দেববর্মা, চয়ন সাহা, দেবরাজ দেব, রাজেশ দেবনাথ, তনুজ সরকার,
সুতীর্থ বিশ্বাস, অভীককুমার দে, বাপ্পা চক্রবর্তী, রূপণ মজুমদার, শুভ্রজিৎ মহাজন,বৃন্দা নাগ,সৌমেন
চক্রবর্তী, চিত্তরঞ্জন দেবনাথ, দেবাশিস দাস, অনিমেষ নাথ, বাপী চক্রবর্তী, ধ্রুব
চক্রবর্তী, ভবানী বিশ্বাস, শুভ দেব, শুভ্রশংকর দাশ-এর কবিতা আমাকে খুব ভাবিয়েছে ।
সুমন
পাঠারী ইতিমধ্যেই তাঁর কবিতায় নিজস্ব একটা
স্বর তৈরী করে ফেলেছে । তাঁর কবিতার বয়ানে, চিত্রকল্পে, উপস্থাপনার অভিনবত্বে
নিজস্ব একটা ভাবনার ছাপ ফেলেছে । জীবন এবং যাপনের চারপাশ থেকে সংগ্রহ করে আনে তাঁর
কবিতার বয়ান । জীবনকে বিশ্লেষণ করে নিজের দেখা জগত থেকে । নিজের লেখাকে সে নিজের
মতো করে বিশ্বাস করে, এটা তার একটা বড় শক্তি। জেরী চন্দের ক্ষেত্রেও দেখেছি অদ্ভুত এক মোহ আছে ।
কাব্য-ভাষায় নিজস্ব একটা ঢঙ আছে । জীবনকে
দেখার মধ্যে তার নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে । এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আলাদা
করে অন্যান্যদের থেকে। একই কথা আমি শুভদীপ
দেব সম্পর্কেও বলতে চাই । সে জীবনকে দুমড়ে-মুচড়ে তার ভিতরের সংকটকে যে দুহাতের মুঠোর ভিতর দেখে নিতে
চায় । তনুজ
সরকারের ভিতরও এই প্রবণতা খেলা করে । নিজস্ব একটা ভাষাশৈলী তৈরীর জন্য সে উদগ্রীব
। চিরশ্রী দেবনাথের জীবনকে খুব মায়াবী চোখে বিশ্লেষণ করেন । তাঁর দেখার মধ্যে একটা
ঘরোয়াপনা আছে । আমাদের দৈনন্দিন যাপনের নানা প্রেক্ষিত থেকে জীবনের আনন্দ- বেদনাকে
তুলে আনেন খুব সুন্দর করে । অভীককুমার দে-ও তাঁর দেখা জগতকে অনায়াসে কবিতায় তুলে
আনেন অনাবিলভাবে । জীবনের সংকটকে আলতো করে তুলে এনে নিয়ে যান চূড়ান্ত এক গভীরতায়। সুতীর্থ তাঁর কবিতায় সটান প্রশ্ন করেন। অনেক সময়
উন্মাদের মতো আক্রমণ করে বসেন সমাজের যাবতীয় ভনিতাকে । রাজেশ দেবনাথ তাঁর কবিতার
আমাদের সমাজের জীবনের চলার পথের ভিতর থেকে যাবতীয় সম্পর্কে দেখেন তির্যকভাবে । মুখ ও মুখোশের অন্তরালকে ভেঙে দিতে চান তাঁর
কবিতা দিয়ে । ভবানী বিশ্বাসের কবিতায় কবির
একটা নিজস্ব গন্ধ পাই । তিনিও তাঁর চারপাশকে ব্যাখ্যা করেন তাঁর নিজের মতো করে ।
জীবনের অলিগলি থেকে কুড়িয়ে আনেন ভালোবাসা- ব্যথা- বেদনার বয়ান ।
শূন্য দশকের পরবর্তী পর্যায়ের সব কবি নিয়ে পৃথকভাবে বলার সময় বা সুযোগ এখানে নেই । তবে এইটুকু বলবো, এই সময়ের কবিরা তাদের নিজস্ব বয়ান নিয়েই কবিতার জগতে উঠে আসতে চাইছেন ।
তারপরও কিছু অতৃপ্তি তো স্বাভাবিকভাবে কাজ করেই । সত্তর- আশি- নব্বই- শূন্য দশকের তুলনায় আজকের জগত আরও জটিল হয়ে পড়েছে । ফ্রয়েডর প্রভাব পেরিয়ে এখন আমরা জুডিথ বাটলারের দিয়ে এগিয়েছি, মার্কস পেরিয়ে লুই আলতুসার, আনতোনিও গ্রামসির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি । বায়ো পলিটিক্স, জিও পলিটিক্স আরও ব্যাপক আকার নিয়েছে দিন দিন । এই মুহূর্তে প্রায় ৩৮টি দেশে গৃহযুদ্ধ চলছে । অন্যদিকে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিকেই সমস্যা আর সমস্যা । আফ্রিকা মহাদেশের ২৯টি দেশে, মধ্য প্রাচ্যে ২৭০টি বিদ্রোহী দল, ইউরোপের ১০টি দেশে ৮০টি বেসামরিক বাহিনী, এশিয়ায় ১৬টি দেশে প্রায় ১৭০টি বিদ্রোহী দল নানা দাবিতে সরাসরি যুদ্ধে সক্রিয় । এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সাথে নিয়েই আমরা মাইক্রো টেকনোলজি থেকে ন্যানো টেকনোলজি পেরিয়ে সেমিকন্ডাক্টর চিপ টেকনোলজির দিকে এগুচ্ছি । AI বা আর্টিফেসিয়াল টেকনোলজির ভয়ঙ্কর দিকে ধাবিত হচ্ছি আমরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে আমরা ক্রমশই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি নিজেদের উপর থেকে । একটা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সেলিকন সেক্স-টয়ের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। স্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য যা রীতিমত আতঙ্কের । ফলে এই প্রজন্মের কবিদের দায়িত্ব আরও অনেক বেড়ে গেছে । জীবন ক্রমে ক্রমে আরও জটিল, আরও সম্পর্কহীন যান্ত্রিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে । কোনো আগল, বন্ধনই সে আর মানতে চাইছে না । পুঁজিভিত্তিক ভাবনা আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে ক্রমেই । আমাদের শৌখিন চাহিদা বাড়ছে দিন দিন । যেখানে হৃদয়ের প্রভাব খুব বেশি থাকছে না । ফলে এই প্রজন্ম নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই ঢিলে হয়ে আসছে । একক পারিবারিক বিভাগেও এখন আর শান্তি নেই । নিরাপত্তা নেই । তাসের ঘরের মতো সম্পর্ক একের পর এক ভেঙে পড়ছে । অন্যদিকে বাংলা ভাষা চর্চা আগামীতে কতটা কী হবে, সে নিয়েও দুশ্চিন্তার পারদ বাড়ছে দিনের পর দিন। এই সব ভাবনা- দুর্ভাবনার ছাপ নিশ্চয়ই আগামী কবিতার আসবে । বা তার প্রভাব রাখবে । কিন্তু কতটুকু রাখতে পারবে ? এখন আমাদের নিজস্ব বলতে আর কিছু নেই । অতি-আধুনিক যান্ত্রিকতার চাপে প্রেম- ভালোবাসায় বিশ্বাস ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে । আমরা একটা কাঠামোগত পর্যবেক্ষণর ভিতর দিয়ে ক্রমেই আমরা আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছি । এখন আমরা কাঠামোগত একটা শোষণের শিকার । আমাদের নিজস্বতা বলতে এখন আর কিছুই থাকছে না। বায়বীয় এক সিসি ক্যামেরা আমাদের পেছন পেছন যেন হেঁটেই চলেছে। আমাদের আগামী জীবনে রহস্য বলে কোনো শব্দ থাকবে কিনা জানি না । এইসবই নিশ্চয়ই আমাদের আগামী জীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে । তখন কী হবে কবিতার চেহারা, কেমন হবে তার প্রকাশভঙ্গিমা ? ঠিক এই জায়গায় আমি কিছুটা হতাশ । এই প্রজন্ম এখনও রোমান্টিকতার সেই মোহমায়া থেকে মাথাঝাড়া দিয়ে উঠে আসতে পারছে না যেন । অথচ মানসিকভাবে আমরা গভীর এক তমসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি ক্রমেই । ব্যক্তি ও সমাজব্যবস্থা আজ যেন একে অন্যের বিপরীতে মুখোমুখি অবস্থান করছে । সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের কাঠামোতে দ্রুই, অতিদ্রত পরিবর্তন আসছে, যা আমাদের পূর্বজদের বেলায় ছিল না । মোবাইলে সেলফি তোলার মতো প্রতিটি মুহূর্তে আমরা কেবল আমাদের নিজেকে দেখে মুগ্ধ হতে চাইছি । অন্যকে দেখার সময় কারও কাছে নেই । সে দায়ও এখন কেউ নিতে চাইছে না । এই পরিস্থিতি আগামীতে আমাদের জন্য কতটা সম্ভাবনা নিয়ে আসবে, আমি অন্তত চিন্তিত ।
এইসব
দুশ্চিন্তা নিয়েই আপাতত আমার আলোচনার ইতি টানছি । সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।

No comments:
Post a Comment