Saturday, August 31, 2024

কবি দেবপ্রতিম দেব, সম্ভাবনাময় এক কবির নাম / তমালশেখর দে


 

           **  কবি দেবপ্রতিম দেব,  সম্ভাবনাময় এক কবির নাম **

                      তমালশেখর দে

 

 

“এখানে সবুজ নেই আর, কত লাশ ছুঁয়ে দেখি

পরাজিত, বিকেলের শোকমিছিল...

                         ... ...

অন্ধকারের নাভি, নিভে দিন, অনিদ্রা এলোমেলো,

অভিমানী রাতের মন্থর আলসেমি” ( মালবিকা , কাব্যগ্রন্থ- কাফের)

                       

“ধর্ষিতার ক্ষত দেখিনি কখনো, দুঃখ বুঝতে পারি;

শব্দহীনতায় যখন মূক, নতুন ভোরের কথা বলতে পারিনি ।

 

দূরত্ব আমাদের –

 

অন্য এক জাহাজকে বহুদূর দেখা যায় শব্দহীন;

দেহসাধনার কথা জেনেও, গূঢ় প্রেমিকতায় ডোবা হয়নি ।” (অঙ্গরাজ - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 

“সাইলেন্সার কেটে ফেলা মোটরবাইকের মতো

এখন সেলফিবাজ সময়, খোলা আকাশের গান হয়

আর মুক্ত প্রেমিকতায় ভরে যায় ইনবক্স !” ( রুদ্র - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 

“ যুক্তি এবং আবেগ যেখানে শেষ হয়,

সেই পৃথিবী অভিজ্ঞতার –

 

মুহূর্তরা চায়ের মতো, ব্যথাগুলো যেন পেয়ালায় গুড়ো।”

( সেদিন, যখন মুখোমুখি ছিলাম, কাব্যগ্রন্থ-কাফের) 

 

“ অচল রাজপথে কুয়াড্রিপ্লেগিক / হুইলচেয়ার” ( কাবেরী - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 

“নিঃশব্দের এই নির্জনতা কোনো  মাদকতা নিয়ে আসে না,

যেন নিঃশব্দের উষ্ণ তাপে ছাঁচ-মূর্ত চুম্বনের দৃশ্য” ( নগ্নতা - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 

“ অনিশ্চয়তার সমস্ত শরীর থেকে বাষ্প হয়ে উঠল / অপেক্ষা” ( মেঘ - কাব্যগ্রন্থ- কাফের)

 

এতক্ষণ পড়ছিলাম বরাক উপত্যকা শিলচরের তরুণ কবি ( জন্মসাল – ১৯৯৫) দেবপ্রতিম দে-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ – ‘কাফের’। ঝরঝরে কবিতা ।  মোট ৫৩টি কবিতা । বড় কবিতা যেমন আছে, তেমনই এক লাইনেরও কবিতা আছে । এই প্রথম পড়ছি তাঁর কবিতা । কবির শব্দ-ব্যবহার, চিত্রকল্পের মুন্সিয়ানা চমকিত করেছে । তিনি সময়কে ধরছেন তাঁর দেখা  জগতের অভিজ্ঞতা থেকে, এটাই মূলত তাঁর কাছ থেকে আমার প্রথম প্রাপ্তি ।  ‘কত লাশ ছুঁয়ে দেখি পরাজিত’ ‘অন্ধকারের নাভি, নিভে দিন, অনিদ্রা এলোমেলো’ ‘ধর্ষিতার ক্ষত দেখিনি কখনো, দুঃখ বুঝতে পারি’ ‘দেহসাধনার কথা জেনেও, গূঢ় প্রেমিকতায় ডোবা হয়নি’ ‘“সাইলেন্সার কেটে ফেলা মোটরবাইকের মতো / এখন সেলফিবাজ সময়’ ‘মুহূর্তরা চায়ের মতো, ব্যথাগুলো যেন পেয়ালায় গুড়ো’ –- এমনসব  কবিতার লাইন পড়তে পড়তে ভাবছিলাম কবিকে নিয়েই।  কবিতা তো  প্রথমত দৃশ্যের খেলা । চিত্রকল্প তার প্রাণ।  তারপর একে একে আরও বহু বিষয় জড়ো হতে থাকে তার পাশ ঘিরে । কিন্তু প্রথমেই আমি ব্যক্তি কবিকে টার্গেট করি, তিনি কী ভাবছেন, কেন ভাবছেন, কীভাবে ভাবছেন। এটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এই সময়টা তার কাছে কীভাবে ধরা দিচ্ছে ! এই সময়ের ভাবনা, আশা- হতাশা, প্রেম- অপ্রেম, রাজনীতি, সমাজ বিভিন্ন বিষয় কীভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাঁর কবিতা, এসবই মূলত নিরীক্ষণ করি ।  

এবং গোটা বিষয়টা পর্যালোচনা করে  আমি পাঠক হিসেবে মুগ্ধ হয়েছি, এইটুকু বলতে পারি । তাঁর কবিতায় সময় কথা বলে । যেটুকু আশা  অন্তত আমরা প্রথম কাব্যগ্রন্থে করতে পারি । মর্ডানিটি, একটি আনডিফাইনেবল জিনিস, যা সতত অস্থির, চঞ্চল এবং অপরিমেয় । প্রত্যেক যুগ নিজের ভাষায় কথা বলে, প্রজন্মে প্রজন্মে কাব্যভাষা, শিল্পভাষা পাল্টে যায় । প্রতিটি যুগ তাঁর নিজের মতো করে শিল্পে, সাহিত্যে, কবিতায়, গল্পে, চিত্রে তার সময়ের পরমতমকে স্পর্শ করতে চায় । কিন্তু কী  সেই পরমতম ? সেটা হয়ত আমরা কোনওদিনই জানব না বলেই মানুষ সভ্যতার শেষ দিন অবধি পরমতমের অন্বষণে ছবি আঁকবে, গান গাইবে, কবিতা লিখবে । সময়ের ভাষা, চিত্র খেলা করবে তার কবিতায় । তার ভাবনার মুদ্রায়। এমন কি উপস্থাপনায় ।  

এটা তো কথিত আছে, – ‘প্রত্যেক যুগ তার  নিজের ভাষায় কথা বলবে !’, এটা দেবপ্রতিমের কবিতায় লক্ষ করলাম। এই নিজস্বতাই একজন কবির মূল ভিত্তি । এখানে কবি দেবপ্রতিমকে আমার খুব সৎ মনে হয়েছে । নিজেকে নিয়েই খেলেছে কবিতায় । নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে যাবার চেষ্টা সে করেনি । কোথাও কৃত্রিম আবেগের আশ্রয় নেয়নি । ধার করেনি কোনো উপলব্ধি । যে লিখেছে, মনে হয়েছে তার যাপিত জীবন মাড়িয়েই লিখেছে । এটাই মূলত আমাকে আকৃষ্ট করেছে । আরও ভালো লেগেছে, তার কবিতা পড়ে মনে হয়েছে, সে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করার আগে নিজেকে প্রচুর সময় দিয়েছে । প্রস্তুত করেছে আগে নিজেকে । নিজের দেখাকে বারবার তলিয়ে দেখেছে, তারপর প্রকাশে এসেছে । নাহলে প্রথম কাব্যগ্রন্থ এত পরিণত হতে পারতো না । এটাও একটা দেবপ্রতিমের বলিষ্ঠ দিক ।

 

“এখনো শহরে কিছু পাবলিক বাথরুম,

এখনো, কাদামাখা ছিনাল নাভি।” (  এখনো শহরে কিছু)                                                                    

 

এই ভাষা, এই চিত্রকল্পের ভিতরে হঠাৎ “নাভি” শব্দের ব্যবহার, এবং ঠিক তার আগে “ ছিনাল” শব্দের ব্যবহার, এই প্রয়োগ  তো মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট শিলচরের কবিতায় এমন ভাষাভঙ্গিমা আমি অন্তত দেখিনি। এবার “পাবলিক বাথরুম” এর সাথে “ছিনাল নাভি” শব্দ দুটিকে পাশাপাশি রেখে কবিতাটা যদি আবার পুনরায় পাঠ করি, আরেকটা ইমেজ তৈরি হয় । দুই লাইনের এই কবিতার ভিতর নিজের ভাবনা এবং তার চারপাশকে খুব সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন কবি। বাড়তি একটি শব্দও ব্যবহার করেন নি। এই বিষয়টা খুব আকর্ষণীয় এবং সম্ভাবনাময় ।  

 

কবি দেবপ্রতিম দেবের কবিতার ভিতর একটা নিজস্ব ঢঙ আছে । ভাবনায় আছে একটা স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি । আগামীতে যা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে আশা করছি । এই যেমন  পরবর্তী কবিতায় দেখছি

 

“তোমার খাবার- ঘরে আমরা দু’জন, একা ডাইনিং, 

না শব্দ,

 

সেই ঝুঁকে যাওয়া মেরুদণ্ড, আড়চোখ, চুল সরানো আর

কপালের ভাঁজ,

সেই একই ভাবে তোমার উঠে পড়া, তারপর লুকোচুরি।” ( দ্যা রিভার-১)

 

ছোট্ট ছোট্ট দৃশ্যপট এঁকে এঁকে কবি এগিয়ে গেলেন একটা সংকটময় সময়ের দিকে ।  নাহলে এই চিত্রকল্প কেন আসলো কবির মননে –

 

 সেই ঝুঁকে যাওয়া মেরুদণ্ড, আড়চোখ, চুল সরানো আর / কপালের ভাঁজ” !

“আরো ঝুঁকে গেছ মনে হল ? ওহ্, হাতে বাজারের ব্যাগ,

ফেরত আসে ঘাড় বাঁকা, লাজুক চাহনি, চিঠি-পত্তর,

 

কিছু বলার আগেই, ধ্যাত্, তোমার ঘর।” (দ্যা রিভার-৩)

 

ছোট্ট বিষয় ! ছোট্ট ব্যথা ! আরও ছোট্ট চাওয়া- পাওয়া ।  কিন্তু কবি কী মুনশিয়ানায় একটা কাব্য-মুহূর্ত বের করে নিলেন দৃশ্যপট থেকে ।  কিন্তু এই ছোট্ট বিষয়ের ভিতরেও যখন পড়লাম –“আরো ঝুঁকে গেছ মনে হল ?” আহা, মনটা কেমন করে উঠল । টুক করে একটা সংকটকেও যেন ধরে ফেললেন কবি । এভাবে প্রেম, প্রেমের গভীরতা, নিজেদের ভিতরের বোঝাপড়া বুঝতে অসুবিধা হয় না । ঠিক যেন একটা ছোটোগল্প । এই তো, কবিতা! কবিতা কি সব সময় গুরুগম্ভীর একটা ব্যাপার ? নিশ্চয়ই না । কবিতা কখনও কখনও একটা অস্বস্তি । দম আটকা অনুভূতি । মন-কেমন-করা  একটা অতৃপ্তি । 

 

“ক্লান্ত সকাল, ঘুম ঘুম পলকে, চুলে গার্ডার, ঘরোয়া

কাজ, ডিউটি,

 

তীব্র দুপুর, খুব শক্ত করে বাঁধা, স্বস্তির খোঁপা, তার নীচে

ঘামবিন্দু, আরো নীচে, ব্লাউজে পড়া চুল, তার পাশে,

সফেদ স্ট্রাইপ,

 

শান্ত, স্তব্ধ, সন্ধেবেলা, ফেরারি পথে, তুমি

দেখছ চাঁদ।” (দ্যা রিভার- ৫)

 

ছোট্ট ছোট্ট প্লটে কবি খুবই সংযমের সাথে এগিয়ে গেলেন তার কাঙ্খিত লক্ষ্যের দিকে । এই কবিতায় কবির পর্যবেক্ষণ মুগ্ধ করেছে । একটাও বাড়তি শব্দ নেই । অথচ কি নিখুঁত দেখা ! আমি ভাবছি – ‘স্বস্তির খোঁপা’-টা জানি দেখতে কেমন হবে ? এই ‘স্বস্তি’ শব্দের ব্যবহারের ভিতরেই তো কবির দেখা । এখানেই তো কবি-সত্তা ! এই দেখা কেউ কাউকে বলে শেখাতে পারে না । এর জন্য চাই ভালোবাসা। প্রেমিকাকে দেখার মায়া । কবিতাকে হৃদয়ে অনুভব করা। “তার নীচে / ঘামবিন্দু, আরো নীচে, ব্লাউজে পড়া চুল ” – এইসব দৃশ্যের ভিতরে সময় কথা বলে । এখানেই দেবপ্রেতিম শক্তিপদ কিংবা বিজিৎকুমার কিংবা অমিতাভ দেবচৌধুররী  থেকে আলাদা । সময়ের তাগিদেই আলাদা । ‘ব্লাউজে পড়া চুল, তার পাশে,/ সফেদ স্ট্রাইপ’ – এই দেখা Gen-Z জেনারেশনের দেখা। এই সংকট তাদের সংকট । এই বলা, এই বলতে না- পারা, এই অপ্রেম, এই না- পাওয়া যেন একান্ত তাদের । সব পাওয়ার মাঝে না- পাওয়ার এক চূড়ান্ত ব্যথায় যেন তারা ক্লান্ত । স্তব্ধ । শান্ত । ঘামবিন্দুর মতো ভিতরে এক ফোঁটা হাহাকার । নিঃশব্দের নির্জনতার মতো যা কাউকে বলার নয় । হজমেরও যেন নয় । ‘সব ভাঙন আদপে যেন  ভাঙন নয়/  থেমে  থাকা আসলে থামা নয়’। কী তবে সেই ক্রাইসিস ? এটাই তো কবির কবিতায় মূর্ত হয়েছে । ছাপ ফেলেছে তার কাব্যের পাঠকের মননেও । এখানেই তো কবির প্রাপ্তি । এবং সার্থকতা ।   

 

“তোমার হলদে শাড়ি কোমরে নিরেট!

 

নাভি ছুঁয়ে, তার আশেপাশে স্পাইরেল ইন্দ্রজাল,

টিপ টিপ করে সমস্ত আঙুল, তলপেটে বেয়ে উঠেছে

বিছানায়” (দ্যা রিভার- ১৩)

 

“পিঠ থেকে বেয়ে উঠতে চায় ঘামের আদ্রতা,

নৈঃশব্দ্যের রাতে, সমুদ্র তরঙ্গ হাওয়ায় কিছু

বর্ণ ধ্বনিয়া তুলছে; আকাশি ব্লাউজে” (দ্যা রিভার- ১৫)

 

যে-কবির যে-স্বভাব, যে-মেজাজ সেই অনুযায়ীই তিনি লেখেন, এটাই স্বাভাবিক । কবি দেবপ্রতিম এখানে লিখছেন হৃদয় এবং অনুভব দিয়ে । আপাতত এই কবির কবিতার  উৎস হৃদয় এবং তার লক্ষ্যও গভীর হৃদয় । কবিতার শব্দাবলীর জন্ম অনুভবে, কল্পনায় তাদের পুষ্টি এবং তারা প্রতিধ্বনি জাগাতে চায় অনুভবে ।

কবি দেবপ্রতিম দেব-এর কবিতা পড়ে আমি সত্যিই মুগ্ধ । ছোটো কবিতার পাশাপাশি বড় কবিতায়ও সে তার প্রতিভা দেখিয়েছে । তবে নিশ্চয়ই তাতে আরও ব্যাপ্তি আসবে । আস্তে আস্তে সমাজ- রাজনীতি- প্রতিবাদ, জীবনের আরও গূঢ় প্রেক্ষাপট অর্থাৎ জীবনের যন্ত্রণা-ক্লান্ত পটভূমি উঠে আসবে । দেবপ্রতিম দেবের মধ্যে আমি সেই উচ্ছ্বাস, সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি ।

 

কাব্যগ্রন্থ ঃ কাফের

কবি – দেবপ্রতিম দেব

শিলচর

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...